রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে নিজ দেশে খনন হওয়া সোনা কিনছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনার চেয়ে ঘরোয়াভাবে সোনা কেনা সস্তা পড়ে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্থানীয়ভাবে বাজার মূল্যের চেয়ে কিছুটা কম দামে সোনা কিনতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং খরচ, মধ্যস্থতাকারীর ফি ও পরিবহনের খরচও কমে যায়। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা কিনতে হলে ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয়। কিন্তু দেশীয় সোনা স্থানীয় মুদ্রায় কিনে রিজার্ভ বাড়ানো যায়—এতে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় না।

ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় সোনার মজুদে ঝুঁকছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক গোল্ড রিজার্ভ সার্ভে ২০২৫’ অনুসারে, বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামীতে র্স্বণ ভান্ডার আরো সমৃদ্ধ করতে আগ্রহী। তবে নিজেদের স্বর্ণ মজুদ বাড়াতে স্থানীয়ভাবে খনন হওয়া সোনা কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খবর সিএনবিসি।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে স্বর্ণ সংগ্রহের ফলে খরচ কম হয়, স্থানীয় শিল্প সহায়তা পায় সেইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভও খরচ করতে হয়। সংস্থাটির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ৩৬টি দেশের মধ্যে ১৯টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি দেশীয় খনি থেকে স্থানীয় মুদ্রায় সোনা কিনছে। আরো চারটি দেশ এই পদ্ধতি বিবেচনা করছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকবিষয়ক প্রধান শাওকাই ফান বলেন, ‘আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ যেমন কলম্বিয়া, তানজানিয়া, ঘানা, জাম্বিয়া, মঙ্গোলিয়া ও ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন নিজেদের দেশে খনন হওয়া সোনা দিয়ে রিজার্ভ তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঘানার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঘানা গোল্ড বোর্ড এপ্রিল মাসে একাধিক খনির সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে তাদের উৎপাদনের ২০ শতাংশ সোনা কিনে নেওয়া যায়। তানজানিয়াও রপ্তানিকারকদের জন্য একই নিয়ম চালু করেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মানের লন্ডন গুড ডেলিভারি (এলজিডি) বার কিনে থাকে। এসব সোনা ডলার, ইউরো বা পাউন্ডে মূল্যায়ন হয় এবং ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের মতো উচ্চ নিরাপত্তার ভল্টে রাখা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনার চেয়ে ঘরোয়াভাবে সোনা কেনা সস্তা পড়ে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্থানীয়ভাবে বাজার মূল্যের চেয়ে কিছুটা কম দামে সোনা কিনতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং খরচ, মধ্যস্থতাকারীর ফি ও পরিবহনের খরচও কমে যায়।

সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা কিনতে হলে ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয়। কিন্তু দেশীয় সোনা স্থানীয় মুদ্রায় কিনে রিজার্ভ বাড়ানো যায়—এতে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় না। শাওকাই ফান বলেন, ‘এইভাবে আপনি আপনার সোনা রিজার্ভ বাড়াতে পারেন, কিন্তু অন্য কোনো রিজার্ভ অ্যাসেট (যেমন ডলার) খরচ করতে হয় না।’

বিশ্বব্যাপী ঋণ বাড়া, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এখন বিভিন্ন ধরণের রিজার্ভ তৈরি করতে চাচ্ছে, যেন হঠাৎ কোনো আর্থিক সংকটে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।

স্থানীয়ভাবে সোনা কেনার আরেকটি সুবিধা হলো দেশের খনি খাত এবং খনি-নির্ভর মানুষদের সহায়তা করা যায়। অনেক দেশে সোনার চাহিদা সীমিত হলেও খনি খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমন উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে কর্মসংস্থান হয় ও স্থানীয় অর্থনীতি সচল থাকে।

তবে এতে কিছু ঝুঁকিও আছে। বৈশ্বিক অর্থায়ন সংস্থা এমকেএস পিএএমপি -এর গবেষণা প্রধান নিকি শিয়েলস বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা কেনা নিরাপদ ও প্রামাণ্য। কারণ তা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে হয়, যা নির্ভরযোগ্য। কিন্তু দেশীয়ভাবে কেনা সোনার বড় অংশই আসে ক্ষুদ্র ও পারিবারিক খনি থেকে—এসব খনির সঙ্গে অনেক সময় শ্রমিক নিপীড়ন, পরিবেশ দূষণ এবং চোরাচালানের মতো বিষয় জড়িত থাকে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চাইলে নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে এই খাতকে নিয়মের আওতায় আনতে পারে বলেও অভিমস বিশ্লেষকদের। শাওকাই ফান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বড় পরিসরে ও বিশ্বাসযোগ্য ক্রেতা হিসেবে এগিয়ে আসবে তখন ক্ষুদ্র খনি শ্রমিকদের জন্য আইনগত ও ন্যায্যভাবে সোনা বিক্রির একটি পথ তৈরি হবে। এর ফলে অপরাধী চক্রের কাছে সোনা যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে। যা হবে দুই পক্ষের জন্যই ‘উইন উইন সিচুয়েশন।’

আরও